নারী উদ্যোক্তা নিপা সেনগুপ্তার ই-কমার্স বিজনেসে সফলতা

মোঃ শামীউল আলীম শাওন, বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ বা নোভেল করোনা ভাইরাস চলমান। ফলে বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই সবকিছুই করে দেয়া হয়েছিল বন্ধ বা লকডাউন। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ও কর্মকাণ্ডে আসে অমূল পরিবর্তন। এমন সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে অনলাইন বা ই-কমার্স বিজনেসের। ফলে বাংলাদেশের কিছু তরুণ উদ্যোক্তারা ব্যতিক্রমী ও বৈচিত্র্যময় স্বদেশী পণ্য নিয়ে অনলাইন বা ই-কমার্স বিজনেস প্লাটফর্মে এসে নিজস্ব পরিচয় সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেছে।

বিশেষত নারীদের জন্য তেমন-ই একটি প্ল্যাটফর্ম ‘উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম’। যা মূলত ‘উই’ নামে পরিচিত। যা ইতিমধ্যেই বর্তমান সময়ের দেশি পণ্য কেনাবেচার সবচেয়ে বড় অনলাইন প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। যেখানে সমগ্রদেশের ঐতিহ্যবাহী স্বদেশী প্রায় সকল ধরণের পণ্য সর্বদাই পাওয়া যায়। আর বর্তমানে অনলাইন এই প্ল্যাটফর্ম এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে।

ঠিক নামের সাথে তাল মিলিয়ে-ই ‘উই’ লক্ষ লক্ষ নারীকে সফল উদ্যোক্তা হতে সহযোগিতা করছে। সবাই এখন উই থেকে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তেমনই একজন উদ্যোক্তা নিপা সেনগুপ্ত (২৩)। তিনি উইতে চলতি বছরের ১৪ জুন যুক্ত হোন।

উইয়ের কর্নধার রাজীব আহমেদ ও নাসিমা আক্তার নিশা কাছে ই-কমার্সে হাতেখড়ি নিয়ে নিপা কাজ শুরু করেন বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী যবের ছাতু ও যবের আটা নিয়ে। যব বিলুপ্তপ্রায় কৃষি পন্য এবং গুনগতমান সম্পূর্ণ খাদ্য ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ার কারনে প্রথম থেকেই উই গ্রুপে ভালো সাড়া আসতে থাকে।

অতীত থেকেই রাজশাহীর অঞ্চলে যবের চাষ হয়ে আসছে। ফলে এখনও গ্রামের অনেক কৃষক যবের চাষ করে থাকে। ফলে ছাতুর প্রধান উপকরন যবের প্রাপ্ততাও ভালো। আবার এ অঞ্চলের নারীরা যবের ছাতুও তৈরি করতে পারে উন্নত মানের।

নিপা সেনগুপ্ত ই-কমার্সে কাজ শুরু করেন মাত্র ৫০০ টাকা মূলধন নিয়ে। উই গ্রুপের নিয়ম মেনে চলতে থাকে পরিচিতি বাড়ানোর কাজ। পাশাপাশি অল্পবিস্তর অর্ডার প্রাপ্তি। আস্তে আস্তে পরিচিতি বৃদ্ধি হতে থাকে। আসতে থাকে পজেটিভ রিভিউ। এরপর কাস্টমারের চাহিদার উপর ভিত্তি করে পণ্যের তালিকায় যুক্ত করেন যব, গম, চাল, মসুর ও ছোলার সংমিশ্রণে পঞ্চ-ব্যাঞ্জন ছাতু। এটাও এ অঞ্চলের ঐতিত্যবাহী খাবার। এরপর ধীরে ধীরে একে একে তার পণ্যের তালিকায় যুক্ত হতে থাকে ভেজালমুক্ত আখের গুড়, পাবনার ঘি, গমের লাল আটা, দেশী ধানের চাল, মৌসুমী আচার, দেশীয় বিলুপ্ত প্রায় ফলের গাছ।

উইতে যুক্ত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে সকল পণ্য মিলিয়ে নিপা সেনগুপ্তর আয় হয়েছে প্রায় এক লক্ষ পাঁচ হাজার টাকারও উপরে। এর সাথে সাথে গ্রুপে পরিচিতিও বেড়েছে।

এ বিষয়ে সফল তরুণ নারী উদ্যোক্তা নিপা সেনগুপ্ত বলেন, “আমি অনার্স চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। পাঁচটি পরীক্ষাও শেষ হয়েছিল। এরমধ্যেই করোনা মহামারীর কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। আর আমিও বাসায় বন্দী হয়ে গেলাম। সারাদিন বসে বসে দিন কাটছিলো এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে উই গ্রুপে যুক্ত হই। এরপর এখান কার নারীদের কাজ দেখে আমি অভিভূত হয়ে যাই।
এই সফল নারী আরও বলেন, প্রথমেই একটি ভালো লাগা তৈরি হয়। আস্তে আস্তে শ্রদ্ধেয় রাজীব স্যার ও নাসিমা আক্তার নিশা ম্যামের দিক-নির্দেশনা গুলো ফলো করতে শুরু করলাম। নিজের প্রতি একটা বিশ্বাস তৈরি হলো। আমার স্বামীর সহযোগিতায় রাজশাহী অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী যবের ছাতু নিয়ে কাজ শুরু করা। কিন্তু ভাবিনি এই ছাতু নিয়েই আমি লাখপতি হতে পারব। বর্তমানের উই থেকে আমার সেল প্রায় এক লক্ষ পাঁচ  হাজার টাকারও উপরে।

আরো অনেক অর্ডার হাতে আছে বলে উল্লেখ করে নিপা সেনগুপ্ত উই গ্রুপের সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সকল নারীদের নিজের একটি পরিচয় সব সময় প্রয়োজন এই ক্ষেত্রে উই গ্রুপের সবাই সবাইকে সহযোগিতা করছে।

নিপা সেনগুপ্তের কাজের সাথে এ অঞ্চলের দুইজন প্রান্তিক নারী যুক্ত হয়ে নিজে আয়ের মাধ্যমে পরিবারকে সহযোগিতা করতে পারছেন। তেমন এক নারী রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের আবেদা বেগম (৪৮) বলেন, “নিপা সেনগুপ্ত বাজার থেকে যব কিনে আমাদের কাছে দেয় আমরাও যবগুলো পরিষ্কার করে শুকিয়ে বালুতে ভেজে দিই। এর জন্য আমরা নিয়মিত টাকাও পাই। যা দিয়ে আমাদের সংসারের অনেক উপকার হয়। আমরা বাড়তি আয় করতে পারি।

উই গ্রুপ থেকে নারীদের একটি পরিচয় তৈরি হচ্ছে যা আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে বলেও উল্লেখ করেন গ্রামের এই নারী।

শেয়ার করুন