অনিয়মে জড়াচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারাও

ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার ও নানা অনিয়মে জর্জরিত দেশের ব্যাংকিং খাত। তবে এসব অনিয়ম রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভ‚মিকা খুব একটা চোখে পড়ে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাজে ক্ষোভ জানিয়েছেন উচ্চ আদালত। সা¤প্রতিক সময়ে কয়েক কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার লোপাটের তথ্য চাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী এবং সাবেক মহাব্যবস্থাপক ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সে বিষয় এবং নন-ব্যাংক আর্থিক খাতে বিভিন্ন সময় অনিয়মের সঙ্গে আরও যে সব কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে- সেসব বিষয় খতিয়ে দেখতে অবশেষে ফেব্রæয়ারি মাসের প্রথম দিকে কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে ‘শুদ্ধি অভিযান’ হিসেবে উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম ওই সময়ে সাংবাদিকদের বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, এর সত্যতা যাচাইয়ে ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, অফিসার থেকে শুরু করে ডিজিএম, জিএম, নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পর্যন্ত বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে অর্থ আত্মসাতে সহায়তা করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীর বিরুদ্ধে যেমন বিভিন্ন কোম্পানিকে সুবিধা করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে, তেমনি বর্তমান ডেপুটি গভর্নর কাজী সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কেলেঙ্কারিতে সবচেয়ে সমালোচিত ব্যক্তি তিনি।

ঋণ কেলেঙ্কারীতে সহায়তা আর অর্থ পাচারে তার নাম যুক্ত থাকার পরেও, ডেপুটি গভর্নর পদে কাজী সাইদুর রহমানের বেপরোয়া প্রতিশোধ পরায়ন আচরণ বাংলাদেশ ব্যাংকের শুদ্ধি অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগের তীর কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের। তাদের অভিযোগ, ডেপুটি গভর্ণর হবার পর এ মাত্রা আরও বেড়েছে। থার্মেক্সসহ বিতর্কিত সব প্রতিষ্ঠানে সুদ মওকুফসহ আরও বেশি ঋণ প্রদানে সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি। এছাড়াও ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকে তিনি গড়ে তুলেছেন একাধিক সিন্ডিকেট।

জানা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ এ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) দায়িত্বে ছিলেন কাজী সাইদুর রহমান। একটানা ১৭ বছর ধরে ওই বিভাগের দায়িত্ব সামলেছেন। ওই সময়ে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রতিটি ঘটনায় কাজী সাইদুর রহমানের যোগসাজশ ছিল বলে মনে করছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা। পরে ২০১৬ সালে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় শাস্তি স্বরুপ সমালোচনার মুখে ২০১৬ সালের মে মাসে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে বদলি করা হয়। পরে ২০১৯ সালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আবার ফিরে আসেন একই বিভাগে।

গত ২২ নভেম্বর ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। তিন মাসের মাথায় প্রত্যেক সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকে নিয়োগ-পদোন্নতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছেন সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া মহাব্যবস্থাপক হিসেবে যথাক্রমে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড এবং নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পরিষদে যুক্ত থাকায় এসব ব্যাংকে থার্মেক্স গ্রæপের মতো বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেয়ার জন্য সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন কাজী সাইদুর রহমান। এছাড়াও যেসব কর্মকর্তার কারণে কাজী সাইদুরের রহমানের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া যায়নি, তাদের জনতা, অগ্রণী ও সোনালী ব্যাংকের ওইসব উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে হেনস্তার শিকার করছেন বলে জানিয়েছেন ওইসব ব্যাংকের উর্দ্ধতনরা। আর ডেপুটি গভর্নর কাজী সাইদুর রহমানের এসব অনিয়মের তথ্য তারা এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ অর্থমন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন।

থার্মেক্স গ্রæপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাদির মোল্লা ও ডেপুটি গভর্নর কাজী সাইদুর রহমান দু’জন মিলে গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাতকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছেন। যা ছিল ব্যাংকিং খাতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জানা যায়, আবদুল কাদির মোল্লার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ আছে ৭০০ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকের ৩৫০ কোটি টাকার মতো। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় প্রতিনিয়ত এ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। আবার প্রণোদনা হিসেবে থার্মেক্সকে ৫৭ কোটি টাকা দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। আর এ প্রণোদনার টাকা দিতে ওই সময় অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অগ্রণী ব্যাংকের বেশ ক’জন পরিচালক জানিয়েছেন। রিজার্ভ চুরিসহ বেশ কিছু ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে শুরসহ বেশ কজনের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হলেও, বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন বর্তমান ডেপুটি গভর্নর কাজী সাইদুর রহমান-তা খতিয়ে দেখার আহবান জানিয়েছে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন