শুধু স্টেডিয়ামের জন্য ১১ কিলোমিটার সেতু                       খালেদা জিয়ার ঈদের দিন যেভাবে কাটলো                       বৈরী আবহাওয়ায় কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়ায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ                       সেলফি তুলতে প্রাণ গেল দুই মেয়ের                       ঈদের ছুটিতে সড়কে গেল ৫৩ প্রাণ       

মাদক সাম্রাজ্যে গডফাদার ১৪১

মাদকের আন্ডারওয়ার্ল্ডে তারা ডন হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ বলেন গডফাদার। তাদের হাতেই দেশের মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। অনেকে সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা। ওয়ার্ড, থানা বা মহানগর নেতা থেকে খোদ সংসদ সদস্য পর্যন্ত। আছেন সিআইপি খেতাব পাওয়া ধনাঢ্য ব্যবসায়ী থেকে সরকারি কর্মকর্তারাও।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সম্প্রতি দেশের মাদক গডফাদারদের একটি তালিকা প্রণয়ন করে। দেশজুড়ে যার সংখ্যা ১৪১ জন। এতে ক্ষমতাধর অনেক রাজনীতিকের ভয়ংকর কুৎসিত চেহারা বেরিয়ে আসে। ৩১ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত তালিকা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্ত মাদক গডফাদারদের নাগাল পেতে ব্যর্থ হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এখন দুদকের দ্বারস্থ হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যানের কাছে তালিকা পাঠিয়ে বলা হয়, অন্তত এদের অবৈধ আয়ের পথ ও বিশাল অর্থবিত্তের খোঁজ পেতে সক্ষম হবে দুদক।সম্প্রতি দুদক সূত্রে গোপনীয় এ তালিকার একটি কপি যুগান্তরের হাতেও আসে। তালিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠার একটি প্যারায় চোখ আটকে যায়। কারণ সেখানে বলা হয়েছে, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি দেশের ইয়াবা জগতের অন্যতম নিয়ন্ত্রণকারী। তার ইশারার বাইরে কিছুই হয় না। দেশের ইয়াবা আগ্রাসন বন্ধের জন্য তার ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।’তালিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ রোববার যুগান্তরকে বলেন, দুদক থেকে মাদক গডফাদারদের নামধাম আমাদের কাছে চাওয়া হয়েছিল। আমরা সেই তালিকা প্রণয়ন করেছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ হাতেনাতে মাদক উদ্ধার ছাড়া আমরা কাউকে গ্রেফতার করতে পারি না। এক্ষেত্রে দুদক আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে।সর্বনাশা বদি ও তার ৫ ভাই : তালিকায় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি বলা হয়েছে। এতে বদির সঙ্গে তার পাঁচ ভাইয়ের নামও উঠে এসেছে। তারা হলেন- মৌলভী মুজিবুর রহমান, আবদুস শুক্কুর, মো. সফিক, আবদুল আমিন ও মো. ফয়সাল। তাদের মধ্যে সরকারের প্রায় সব সংস্থার তালিকায় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ছাড়া তার ৫ ভাইয়ের নাম রয়েছে। তবে আপন ভাই ছাড়াও তালিকায় বদির পিএস মং মং সেন ও ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপুসহ আরও বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠভাজনের নাম রয়েছে।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকা সংক্রান্ত গোপনীয় প্রতিবেদনের ভূমিকা অংশে বলা হয়েছে, ‘সরকারদলীয় এমপি হওয়ার সুবাদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারী/সহযোগী নিয়ে তিনি ইচ্ছেমাফিক ইয়াবা ব্যবসাসহ অন্যান্য উৎস হতে অবৈধ আয়ে জড়িত আছেন। শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তার অনিচ্ছার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসা করার সাহস রাখে না। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জেলার অন্য শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বা টেকনাফের যে কোনো চাঁদাবাজ এলাকায় প্রভাব বিস্তারে সক্ষম নয়। বিশেষত মিয়ানমার থেকে চোরাচালান হওয়া ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করার জন্য তার ইচ্ছাশক্তি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’স্থানীয় সূত্র জানায়, মিয়ানমার হয়ে ভিআইপি প্রটেকশনে ইয়াবার বড় বড় চালান টেকনাফে নিয়ে আসার কাজটি করেন বদির ৫ ভাই। আর সেগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাইকারি ডিলারদের কাছে পৌঁছে দেন পিএস মং মং সেনসহ তার নিজস্ব অনুসারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজার জেলার একজন পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজেই মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের দর্শকের ভূমিকায় হাত গুটিয়ে বসে থাকার আর কোনো উপায় থাকে না। সবাই সবকিছু জানলেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল বেছে নিতে বাধ্য হন।এ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির বক্তব্য জানার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার রিং করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বক্তব্য চেয়ে রোববার বিকাল ৪টা ৫৩ মিনিটে ক্ষুদেবার্তা পাঠানোর পর থেকেই তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।সাইফুলের হাত কতটা লম্বা : কেউ কেউ বলেন, ইয়াবা ব্যবসায়ী সাইফুল করিম ওরফে হাজী সাইফুল ইয়াবার আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি। মাদক ব্যবসা করে তিনি এখন শত কোটি টাকার মালিক। তবে অন্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার পার্থক্য আছে। কারণ সাইফুল অনেক উপরতলার মানুষ। তার হাতও অনেক লম্বা।সাইফুলের ক্ষমতার সামান্য ধারণা পাওয়া যায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের এক কর্মকর্তার কথায়। তিনি বলেন, সাইফুলের ঘনিষ্ঠ এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে কয়েক মাস আগে আটক করা হয়েছিল। এরপর পুলিশ প্রশাসনের এমন উচ্চপর্যায় থেকে ফোন আসে, যা কল্পনাও করা যায় না। এরপর থেকেই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সাইফুলকে অনেকটাই সমীহ করে চলেন। এ সুযোগে সাইফুলের ইয়াবা ব্যবসা রমরমা।সূত্র বলছে, হাজী সাইফুল বিএনপির নেতা গোছের লোক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি তার ভোল পাল্টে যায়। স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা চোখে পড়ার মতো।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় বলা হয়েছে, সাইফুল করিম একজন সিআইপি (বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি)। স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তিনি জড়িত। তবে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় তিনি অর্থ দিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থান করে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।স্থানীয় প্রশানের কয়েকটি সূত্র জানায়, সাইফুল নিজেকে আমদানি-রফতানিকারক বলে পরিচয় দেন। তার বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ডের নাম এসকে ইন্টারন্যাশনাল। কিন্তু গত কয়েক বছরে তার সম্পদ যেন ফুলেফেঁপে উঠেছে, যা অনেক প্রশ্নের দাবি রাখে। কাজীর দেউড়ি ভিআইপি টাওয়ারে একাধিক অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট, কক্সবাজার কলাতলী পয়েন্টে হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নির্মাণকাজ চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, সাইফুলের হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়ার নেপথ্যে আছে মূলত ইয়াবার চোরাচালান।উপজেলা চেয়ারম্যানও কম যান না : টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ ওরফে জাফর চেয়ারম্যানও কম যাননি। ছেলে মোস্তাককে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী ইয়াবা সিন্ডিকেট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় তাদের অবস্থান যথাক্রমে ২ ও ৩ নম্বরে। এতে বলা হয়েছে, ‘পিতা-পুত্র একত্রে রাজনীতি ও ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে তৎপর। জাফর চেয়ারম্যান বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও ৫-৬ বছর আগে তিনি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।’ইয়াবা গডফাদার হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে যুগান্তরের কক্সবাজার অফিস থেকে টেকনাফ উপজেলা পরিষদে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে জানানো হয়, চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ বিদেশে রয়েছেন। তার ছেলে মোস্তাক দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। তাকে গুম করা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন।তালিকার ৪ নম্বরে আছেন সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএ) মং মং সেন। তার বাবার নাম অং সেন। টেকনাফ পৌরসভার চৌধুরীপাড়ায় তার বাড়ি। টেকনাফ থানা সূত্র জানায়, মং মং সেন ঢাকায় একাধিকবার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন। কিছুদিন আগে তিনি একটি মাদক মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন কক্সবাজারে ফিরেছেন। এছাড়া এমপি বদির ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেলের নামও আছে তালিকায়।তালিকার ৭ নম্বরে থাকা জাফর ওরফে টিটি জাফরের ইয়াবা নেটওয়ার্ক দেশজুড়ে। আগে তিনি হুন্ডি ব্যবসা করতেন। হুন্ডি জগতেও তিনি মাফিয়া হিসেবে পরিচিতি পেলে তার নাম হয় টিটি জাফর। পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডির তালিকায়ও টিটি জাফরের নাম রয়েছে। তবে সেখানে তার পরিচয় আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানি হিসেবে।বিস্ময়কর ব্যাপার হল, স্থানীয়ভাবে ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক নেতা হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন নেতার নামও ইয়াবা গডফাদারদের আশ্রয়দাতা হিসেবে তালিকায় উঠে এসেছে। যেমন বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর ছেলে রাশেদ ও মাহবুব মোরশেদের নাম আছে যথাক্রমে তালিকার ১১ এবং ৪৭ নম্বরে।তালিকার ১৬ নম্বরে থাকা মাদক গডফাদার মীর কাশেম ওরফে কাশেম মেম্বারের পরিচয়- তিনি সরাসরি জাহাজে করে ইয়াবার চালান পাচার করেন। ১৭ নম্বরে থাকা সৈয়দ হোসেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর হোসেনের ভাই। তালিকার ২০ নম্বরে আছে আক্তার কামাল ও শহীদ কামাল দুই ভাইয়ের নাম। এরা স্থানীয় এমপি বদির আত্মীয়।তালিকায় বলা হয়েছে, এরা বদির বোনজামাই পুলিশের সাবেক ওসি আবদুর রহমানের খালতো ভাই। স্থানীয়ভাবে এরা বদির বেয়াই হিসেবে পরিচিত। তালিকার ৩২ নম্বরে থাকা মৌলভী আজিজের নামটি খুবই উল্লেখযোগ্য। কারণ তিনি স্থানীয়ভাবে একজন দানশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, দানশীলতার আড়ালে তার আসল পরিচয় ইয়াবা গডফাদার।মৌলভী আজিজের সঙ্গে রোহিঙ্গা কানেকশন অনেক শক্তিশালী উল্লেখ করে স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আজিজ মূলত রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের জন্য বিদেশ থেকে অনুদান আনেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তিনি মোটা অঙ্কের অনুদান পেয়ে থাকেন। এখন তার ইয়াবা নেটওয়ার্ক দেশের বাইরেও আছে কিনা, তা ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি বেশ প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত।তালিকার ৮৪ নম্বরে আছে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রেহানা আক্তারের ভাতিজা ইসমাইল হোসেনের নাম। তার বাড়ি ফেনী সদরের কাজীরবাগ এলাকায়। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় মাদক গডফাদারদের মধ্যে আছে বিহারি ক্যাম্পের ইশতিয়াক, রামপুর থানা যুবলীগ নেতা তানিম ও মেরুল বাড্ডার স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জয়নালসহ মোট ৩২ জন।এছাড়া তালিকায় রাজশাহী বিভাগের মোট ২১ জন হেরোইন গডফাদারের নাম রয়েছে। এরা সীমান্তের ওপার থেকে বড় বড় হেরোইনের চালান এনে রাজশাহীর গোদাগাড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় বিক্রি করেন।


  • ক্রাইমনিউজবিডি.কম

    © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
    সম্পাদক ও প্রকাশক:
    মোঃ গোলাম মোস্তফা
    সুইট -১৭, ৫ম তলা, সাহেরা ট্রপিক্যাল সেন্টার,
    ২১৮ ডঃ কুদরত-ই-খোদা রোড,
    নিউ মার্কেট ঢাকা-১২০৯।
    মোবাইল - ০১৫৫৮৫৫৮৫৮৮,
    ই-মেইল : mail-crimenewsbd2013@gmail.com

    এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি
    অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও
    প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

  • গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • সামাজিক মাধ্যম