সুইসাইড নোট লেখা আর্জেন্টাইন সমর্থকের লাশ উদ্ধার                       হত্যা মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে রায় ২ জুলাই                       পাবনায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১                       পাবনায় বন্দুকযুদ্ধে পুলিশ হত্যা মামলার আসামি নিহত                       একদিনে সড়কে নিহত ৫২       

ফেসবুক, বন্ধু তোর লাইগা রে

যখন হাতে কাজ বেশি, তখনো ‘বন্ধু কালায় বাজায় বাঁশি’। আনচান করে ওঠে মন, ‘কোন বনে বাজাও গো বাঁশি, মন বিদরে যায়’। রাধার মতো কাজ ফেলে পালানোর সেই বৃন্দাবনও ফেসবুক। ফেসবুক একের মধ্যে বহু। কীভাবে, সেটা পরে বলছি।আমার কমসে কম পাঁচ হাজার বন্ধু, আর হাজারো ফলোয়ার। যার যত বন্ধু, সে তত সেলিব্রিটি, ফেসবুকের বন্ধুসভায় তত ডাঁট তার। শত শত শেয়ার, হাজার হাজার লাইক। ‘আমার মতন সুখী কে আছে। আয় সখী, আয় আমার কাছে?’ কিন্তু আমার অবস্থা ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়্যার, নর আ সিঙ্গল ড্রপ টু ড্রিংক’। ইংরেজ কবি কোলরিজেও আগে ফকির লালন সাঁই বুঝতে পেরেছিলেন, ‘ফকির লালন মরল জল পিপাসায় রে/ কাছে থাকতে নদী মেঘনা।’ফেসবুকে যা-ই চাইবেন, একটা নিলে আরেকটা ফ্রি। খ্যাতি চাইলে দুর্নামও রটবে। বন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে আসবে ঈর্ষাপরায়ণ শত্রু। যত বন্ধু আপনার, ততই নিঃসঙ্গ আপনি। সারা জীবনে হাতে গোনা তিন-চারজন ভালো বন্ধু পেয়েছি আমি। তাদের ফিরে পেলে ফেসবুকের হাজারো বন্ধু, লাখো ফলোয়ার বিসর্জন দিতে রাজি। শৈশবে, তারুণ্যে ওরা ছিল ‘পরানসখা, বন্ধু হে আমার’। আর ফেসবুকের আমি-তুমি-সে, সক্কলেই ডিসপোজিবল, অপসারণযোগ্য। ‘কী খবর বলো’ বলা সেই সব বন্ধু আর ফেসবুকের অ্যাড ও ডিলিটিযোগ্য বন্ধুত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। এটা যতটা না বন্ধুত্ব, তার চেয়ে নেটওয়ার্ক। নেটওয়ার্ক প্রচারে লাগে, বিজ্ঞাপনে লাগে, রাজনীতিতে লাগে, ব্যবসায় লাগে। বাস্তব জীবনে আমাদের লাগে মনের মিল, মানবিক বন্ধন ও সমসমাজ।পোলিশ সমাজতাত্ত্বিক জিগমুন্ট ব্যোম্যান বলেন, আমরা কমিউনিটি বা সমসমাজে জন্মাই ও বেড়ে উঠি। আমাদের সত্যিকার সম্পর্কগুলো সেখান থেকেই পাওয়া। নেটওয়ার্ক আমরা বানাই, কিন্তু তাতেই আবার আমরা বন্দী হই। নেটওয়ার্কের জালে নিঃসঙ্গ মাকড়সার মতো আমরা বসে থাকি। নেটওয়ার্ক বানাতে ও টিকিয়ে রাখতে দুটি কাজ করতে হয় আমাদের। কানেকটিং আরেকটা ডিজকানেক্টিং। আমার মনের সাইটে আমি তো কানেকশন-ক্ষুধার্ত। সম্পর্কের বদলে আমরা এখন চাই কানেকশন, কানেকশনই পাওয়ার, কানেকশনই ডিজায়্যার। কিন্তু কানেক্ট করতে গেলে আবেগের শর্টসার্কিট তো হবেই। তখন আমরা একটা ক্লিকেই ডিজাকানেক্ট করে দিই, আনফ্রেন্ড করে দিই, আরও বেশি হলে ব্লক করে দিই। ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো সোজা, সংক্ষিপ্ত উপায়। সম্পর্ক যেন প্লাগের মতো, একবার এই সকেটে লাগালাম, ভালো না লাগলে আনপ্লাগ্ড করে চলে গেলাম অন্য সকেটের খোঁজে। অথচ বোঁটা থেকে একটি পাতা ছিঁড়লেও বেদনার কষ জমে, বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছেঁড়ায় কত হাহাকার, কত বেদনা, কত স্মৃতি। ফেসবুক বন্ধুত্বের বোধ হয় স্মৃতি থাকে না, আপনি ভুলে যান কিন্তু ফেসবুক মনে করিয়ে দেয়। আমাদের স্মৃতির মালিকও এখন ফেসবুক।আমাদের কতজনের সমাজ নেই, কমিউনিটি নেই, এলাকা নেই; অনেকেই পরিবার-পরিজন ছাড়া। প্রথম আলোর তারুণ্য জরিপ বলছে, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে তরুণেরা খুবই উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন হয়ে বেশির ভাগই কী করে? না, সত্যিকার সম্পর্ক গড়তে যায় না। যায় ফেসবুকে, যায় হোয়াটসঅ্যাপে। যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব ভেবে তারা আসলে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ায় ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে। আগেকার বাউল-কবি-ভবঘুরেদের জায়গায় এসেছে এই ফেসবুক-ভবঘুরে। সেখানে আমরা সবাই আউটসাইডার—অন্যের জীবনে আগন্তুক। টাচ স্ক্রিন ছুঁতে ও দেখতে দেখতে আমরা কি ভুলে যাচ্ছি মানবিক স্পর্শ, মুখের মায়ার সুখ।এই নিঃসঙ্গ, প্রেমতৃষিত, ইগোকাতর মানুষের জন্য সত্যিকার বন্ধুত্বের বিকল্প হলো ফেসবুক-বন্ধুত্ব, ভার্চ্যুয়াল নেটওয়ার্ক। ফ্রেন্ডলিস্টের অঙ্ক বাড়লে ভাবব, আহ কত বন্ধু আমার। লাইক পেলে ভাবি, ইশ্‌, কতজন পছন্দ করে আমাকে। ইনবক্সের সুড়ঙ্গ দিয়ে কতজনের কাছে মনের কথা বলার সুযোগ আমার; প্রেম এবার না হয়ে যাবে কই? কিন্তু দিন শেষে যদি আপনার পাশে সত্যিকার কাউকে না পান, না পান মুখের দিকে তাকানোর প্রিয় মুখ, না পান ভরসা, বন্ধুর কাঁধ, তখন নিজেকে কি মনে হবে না জালের কেন্দ্রে বসে থাকা ওই নিঃসঙ্গ মাকড়সার মতো করুণ ও হাস্যকর?হোক, তবু তো এই নেটওয়ার্কের সুতাটা আমার হাতেই। চাইলেই বাদ দিতে পারি, চাইলেই নিতে পারি। তোমাকে আমার দেয়ালে এসে আমার ছবি বা কথার তলেই কথা বলতে হবে। আমার ওয়ালে আমিই রাজা, আমিই শাহজাদি। নিঃসঙ্গতার মধ্যে এইটুকু শুধু সুখ, আমরা দুজন এক নেটওয়ার্কেই ঘুরি। অপরের গতিবিধি লুকিয়ে দেখার বাসনাও এখানে আরাম পায়। যার কিছু নেই, তার থাকে শুধু অন্ধকার আর মুখোমুখি হওয়ার ফেসবুক।কিন্তু এই সহজ বন্ধুত্ব করতে করতে আমরা ভুলে যাই যে বন্ধু হতে সহানুভূতি লাগে, সামাজিক দক্ষতা, যোগাযোগপটুত্ব লাগে। রাস্তায় নামলে, কর্মস্থলে, অচেনা পরিবেশে অজস্র মানুষের মধ্যে কীভাবে চলব, কীভাবে মিশব, কীভাবে আত্মিক ক্ষুধাটা সত্যিকার মানুষ দিয়ে মেটাব, ফেসবুক নেটওয়ার্ক তার কতটা শেখায়? সোশ্যাল মিডিয়ার সংলাপ, আলোচনা, তর্ক সাতিশয় সংঘাতপ্রবণ। ফল হলো ‘আনফ্রেন্ড’ ‘ব্লক’ ‘রিপোর্ট’ ইত্যাদি। অথচ এই মিডিয়াকে আমরা জানাশোনা ও মেশামিশির দিগন্ত বাড়ানোর কাজে না লাগিয়ে, এডিট করে করে একান্ত কমফোর্ট জোন বানাতে চাইছি। এভাবে নিজের অহং, নিজের খুশির খাই মেটাতে মেটাতে যার যার ফেসবুক হয়ে ওঠে একটা ইকোচেম্বার, যেখানে শুধু নিজের কথারই প্রতিধ্বনি। এ এমন এক ছলনাময় আয়নামহল, যেখানে শুধু নিজেরই মুখের প্রতিবিম্ব ভাসে।ফেসবুক একের মধ্যে বহু। বন্ধু খুঁজতে এসে দেখি কত নিঃসঙ্গ আমি। অনুভূতি জানাতে গিয়ে অন্যের কথায় মনের কোমল রোয়াগুলো ছ্যাঁকা খেয়ে পুড়ে যায়। ফেসবুক যতটা ভার্চ্যুয়াল মজা দেয়, তার চেয়েও বেশি কেড়ে নেয় ‘রিয়াল’ জীবন। ফেসবুক খুবই দরকারি, কিন্তু একই সঙ্গে এটা একটা ফাঁদ। ফেসবুক বন্ধু নয়, ফেসবুক শুধুই একটা নেটওয়ার্ক, এমন এক মহাসড়ক, যার দুপাশে নাই হাঁটার জায়গা, ছায়াঘেরা শীতল মাটি, নাই গতির রাস্তা থেকে নেমে ধীরে ধীরে কোথাও যাওয়ার উপায়। অনন্ত কোলাহলে এখানে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে হয়। সিলেটের গীতিকবি সৈয়দ শাহ নূরের গানের ভাষায় আমার ফেসবুক হলো,
‘অরণ্য জঙ্গলার মাঝে আমার একখান ঘর
ভাইয়ো নাই বান্ধবও নাই মোর
কে লইবো খবর হায়রে
বন্ধু তোর লাইগা রে……।’

 ‘সকলেই আশ্রয়ের কথা ভাবছে’। মানুষই মানুষের আশ্রয় হয়, বন্ধু হয়, ফেসবুক একটা মিডিয়াম বা রাস্তা মাত্র। মিডিয়ামই মেসেজ নয়, এটা বার্তা পৌঁছানোর একটা রাস্তা মাত্র। বন্ধুগণ, রাস্তায় বসে পড়বেন না। ঘরে ফিরুন বা নদী-পাহাড়-জঙ্গলে যান, কিংবা তাকান মানুষের মুখের দিকে, দেখবেন, সেই মুখও নিরাশ্রয়ী, সেই মানুষও আশ্রয় খুঁজছে, বন্ধু খুঁজছে। আপনিও তাকে খুঁজুন।


  • ক্রাইমনিউজবিডি.কম

    © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
    সম্পাদক ও প্রকাশক:
    মোঃ গোলাম মোস্তফা
    সুইট -১৭, ৫ম তলা, সাহেরা ট্রপিক্যাল সেন্টার,
    ২১৮ ডঃ কুদরত-ই-খোদা রোড,
    নিউ মার্কেট ঢাকা-১২০৯।
    মোবাইল - ০১৫৫৮৫৫৮৫৮৮,
    ই-মেইল : mail-crimenewsbd2013@gmail.com

    এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি
    অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও
    প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

  • গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • সামাজিক মাধ্যম