টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে একই পরিবারের নিহত ৩                       নির্বাচনের আগে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারে সতর্ক র‍্যাব: বেনজীর                       শাহজালালে ৭ কেজি স্বর্ণসহ মালয়েশীয় নাগরিক আটক                       রাজধানীর যে সব এলাকায় ১০ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না আজ                       রাজধানীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩       

উন্নয়ন ও বাজারসুবিধার জন্য নতুন লড়াই

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বেরিয়ে আসার পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের তৈরি করা এলডিসি শ্রেণিভুক্ত হয়। বিশ্বের অধিকতর গরিব ও দুর্বল দেশগুলোর প্রতি আলাদাভাবে মনোযোগ দেওয়ার জন্য এই বিশেষ শ্রেণি তৈরি করা হয়। সহজে ঋণ ও অনুদান প্রদান করা, বিশ্ব বাণিজ্যের নানা ধরনের বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা, পণ্য রপ্তানির জন্য বাজারসুবিধা দেওয়ার মতো নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে ধীরে ধীরে তাদের ভগ্নদশা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা দেওয়া হয়। এসব সহায়তার মাধ্যমে একপর্যায়ে এসে যখন কোনো দেশ একটা মোটামুটি স্বনির্ভরতা অর্জন করে, তখন আর তাকে এই কাতারে রাখার প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে।


বলা যায়, বাংলাদেশ এখন সেই পর্যায়ে চলে এসেছে। আর তার প্রতিফলন ঘটেছে এলডিসি থেকে উত্তরণের তিনটি বৃহত্তর মানদণ্ডে। এগুলো হলো মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক নাজুকতা। এগুলো নিয়ে পরিসংখ্যান সহযোগে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়ে বরং এটুকু বলাই যথেষ্ট যে গড়ে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন এমন হয়েছে, যা দিয়ে তারা সবাই জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ করতে পারছে; প্রায় সবাই মৌলিক শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে; এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি অন্তত এমন এক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে যে ছোটখাটো তো বটেই, মাঝারি ধরনে ঝড়ঝাপটায় কিছু ডালপালা ভাঙলেও শিকড় উপড়ে যাবে না। এ বিষয়গুলো তিন মানদণ্ডের বিভিন্ন সূচকে নানাভাবে উঠে এসেছে। সে কারণেই গত মাসে মাসে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে বাংলাদেশ এলডিসির কাতার থেকে বেরিয়ে আসার পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেছে।

যোগ্যতা অর্জন করার পরের ধাপ হলো এই যোগ্যতা বজায় রাখা। জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী আগামী ছয় বছর বাংলাদেশকে এই যোগ্যতা ধরে রাখতে হবে বা প্রমাণ করতে হবে বাংলাদেশের অর্জন টেকসই। তাহলেই ছয় বছর পরে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের গায়ের সঙ্গে লেগে থাকা এলডিসি তকমাটি পুরোপুরি অপসারিত হবে। অর্থাৎ এই ছয় বছর হলো বাংলাদেশের জন্য ক্রান্তিকাল। দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির চলমান ধারা যে অব্যাহত থাকবে আগামী দিনগুলোয়, তা একরকম নিশ্চিত। এটাও সত্যি যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলায় করেই তা ধরে রাখতে হবে।

পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হয়ে ওঠার অভিযাত্রায় ভবিষ্যতে যে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি হবে, সেগুলো মোকাবিলা ও কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পণ্য রপ্তানির বাজারসুবিধা পাওয়া। এটা ঠিক যে এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন বাজারসুবিধা ২০২৭ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে এই সময়ের মধ্যে আর নতুন করে কোনো বাজারসুবিধা পাওয়ার সুযোগ খুব কম। বরং এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার পর বিভিন্ন বাজারে যে বাড়তি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হবে, তা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদে সব উন্নত দেশে ৯০ শতাংশ থেকে শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাচ্ছে। ফলে এসব দেশে পণ্য রপ্তানিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ধরনের শুল্ক প্রদান করতে হয় না। তবে এই শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাওয়া নির্ভর করে বিভিন্ন দেশের নির্দিষ্ট করে দেওয়া কাঁচামালের উৎসবিধি বা রুলস অব অরিজিন পরিপালন করার ওপর। যেমন কানাডায় পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হলে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার মাত্র ২৫ শতাংশ হলেই চলে। বাংলাদেশসহ সব এলডিসির জন্য এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শিথিল উৎসবিধি।

এলডিসির কাতার থেকে বেরিয়ে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান শুল্কমুক্ত বা শুল্কছাড় সুবিধা বহাল থাকবে না। উন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ তখন ভারত বা পাকিস্তানের মতো আরেকটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবেই বিবেচিত হবে। ফলে ওই সব দেশের পণ্যের ওপর যে হারে শুল্ক আছে, সেই একই হারে শুল্ক বাংলাদেশি পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ হিসাব কষে দেখিয়েছে যে সার্বিকভাবে বাংলাদেশি পণ্য প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তি শুল্কের মুখে পড়বে। এতে করে বছরে পণ্য রপ্তানি লোকসান গুনবে ২৭০ কোটি ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অস্ত্র বাদে সবকিছু (ইবিএ) বাজারসুবিধার আওতায় এখন ৯৭ দশমিক ৮০ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পরে এসব পণ্যে গড়ে ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ শুল্ক বসবে। আর প্রধান তৈরি পোশাকের বেলায় তা হবে ১২ শতাংশ। একইভাবে কানাডায় পণ্য রপ্তানির গড় শুল্ক হবে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে এখন গড়ে ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হয়। এই হার প্রায় একই রকম থাকবে। আবার চীন, ভারতের মতো অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাংলাদেশকে যেসব শুল্কছাড় সুবিধা দিয়েছে, সেগুলোও স্বাভাবিকভাবেই বহাল থাকবে না। তার মানে, গোটা বিশ্ব বাজারেই বাংলাদেশি পণ্যকে কমবেশি শুল্ক বাধা মোকাবিলা করতে হবে।

সুতরাং যে রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি, সেই রপ্তানি এই ধরনের চাপের মুখে পড়লে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। কিন্তু এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে কিছু সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা নির্ভর করে ক্রমাগত দর-কষাকষি ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির ওপর। বিকল্প হিসেবে উন্নত বিশ্বের বাজারগুলোয় বাজারসুবিধা পেতে এসব দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার কথা ভাবা যায়। যদিও এসব এফটিএ এখন আর শুধু পণ্য বাণিজ্যে সীমিত থাকে না, বরং সেবা খাত, শ্রমমান ও মেধাস্বত্ব আইন পরিপালনের মতো কঠিন শর্তযুক্ত হয়।

তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে শুল্কের চেয়েও বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে নানা ধরনের অশুল্ক পদক্ষেপ। পণ্যের উন্নততর গুণাগুণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের বাজারে বিভিন্ন রকম কারিগরি, স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত মান পরিপালন করা দুরূহতর হতে পারে। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ও পরিবেশের সুরক্ষার তাগিদে এ ধরনের বিভিন্ন মান নির্ধারণ করছে ও করবে। পাশাপাশি এসব মান অনেক সময়ই বাণিজ্যের বাধা হিসেবেও আসে।

এমতাবস্থায় দেশের পণ্য রপ্তানিকারকেরা উন্নয়নশীল হয়ে ওঠা বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ নিতে কতটা প্রস্তুত আছে বা কতটা প্রস্তুত হতে পারবে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা বরাবরই কমবেশি রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও ভর্তুকি পেয়ে অভ্যস্ত। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সরকারও তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। আবার যে খাত যত শক্তিশালী ও শিল্পমালিকেরা যত সংগঠিত, সে খাত তত বেশি সহায়তা-সমর্থন পায়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো তৈরি পোশাক খাত। তিন দশক ধরে বিকশিত হয়েও এমন কোনো বছর নেই, যেখানে তৈরি পোশাক শিল্পমালিক ও রপ্তানিকারকেরা কয়েক দফা সমস্যা উপস্থাপন করেননি আর নানামুখী যৌক্তিক-অযৌক্তিক সুবিধা চাননি। সরকারও তাতে কমবেশি সাড়া দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রবণতা মনে রাখলে এটা স্পষ্ট যে ভবিষ্যতে তারা উন্নত বিশ্বের বাজারে পণ্য রপ্তানির শুল্ক মোকাবিলায় বড় ধরনের ভর্তুকি ও প্রণোদনা সুবিধা দাবি করবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি প্রস্তুতকৃত ওষুধ রপ্তানির জন্য নগদ সুবিধা চেয়েছে এলডিসি-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়।

কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারক এবং শিল্পোদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের এটাও উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে এলডিসি থেকে উত্তরণের মানে হলো অধিকতর প্রতিযোগিতার জন্য বিশ্ব ময়দানে নামা। ঢাকঢোল পিটিয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনকে ঘিরে উৎসব পালন করতে গিয়ে এই কঠিন বাস্তবতা ভুলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বরং অধিকতর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাজারসুবিধা আদায়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমঝোতার জন্য এখন থেকেই কর্মকৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।


  • ক্রাইমনিউজবিডি.কম

    © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
    সম্পাদক ও প্রকাশক:
    মোঃ গোলাম মোস্তফা
    সুইট -১৭, ৫ম তলা, সাহেরা ট্রপিক্যাল সেন্টার,
    ২১৮ ডঃ কুদরত-ই-খোদা রোড,
    নিউ মার্কেট ঢাকা-১২০৯।
    মোবাইল - ০১৫৫৮৫৫৮৫৮৮,
    ই-মেইল : mail-crimenewsbd2013@gmail.com

    এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি
    অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও
    প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

  • গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • সামাজিক মাধ্যম